বর্তমান ডিজিটাল যুগে ভুয়া সংবাদ এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার চ্যালেঞ্জ এক ভয়াবহ বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডার অস্তিত্ব যুগের পর যুগ ধরে থাকলেও, ডিজিটাল মাধ্যমের সহজলভ্যতা এবং ব্যাপক প্রসারের ফলে আজকের ভুয়া সংবাদ একটি বিশেষ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যা সমাজ, রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে এবং কখনো কখনো হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতি।
ডিজিটাল মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, এই কন্টেন্টগুলো মানুষের আবেগ, রাজনীতি, ধর্ম ও চিন্তা- চেতনাকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্য নিয়েই তৈরি করা হয়, যা সহজেই শেয়ার করার প্রবণতা সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, অনেক ব্যবহারকারী যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনলাইনে যা পান, তাই বিশ্বাস করে ফেলেন এবং শেয়ার করেন।
এমনকি, বর্তমানে ডিপফেক প্রযুক্তির মতো উন্নত প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও বা অডিও তৈরি করা হচ্ছে, যা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝা কঠিন করে তুলেছে। এ ধরনের প্রযুক্তির মাধ্যমেএকজন ব্যক্তির এমন সব ছবি ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হয় যেখানে উক্ত ব্যক্তি এমন কথা বা বক্তব্য প্রদান করছেন যা আসলে তিনি কখনোই বলেননি। কিন্তু খুব দ্রুত পর্যাপ্ত প্রযুক্তি সহায়তা ছাড়া সে সব ভিডিওকে নকল বলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়ন। বর্তমানে অনেক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য ভিউ, ক্লিক এবং শেয়ারের ওপর নির্ভর করে কন্টেন্টের সফলতা মাপা হয়। এই মানদণ্ড কন্টেন্টের গুণমান নয়, বরং তার ‘পারফরম্যান্স’কে গুরুত্ব দেয়। ফলে ফ্যান্সি হেডলাইন এবং আকর্ষণীয় ছবি দিয়ে তৈরি করা ভুয়া কন্টেন্ট সহজেই ভাইরাল হয়ে পড়ে।
ভুয়া সংবাদের ফলে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়, তা প্রযুক্তিগত সমস্যার চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক। মানুষ বুঝতেও পারে না, তারা কখনো কখনো এই সমস্যার অংশ হয়ে উঠছে, কারণ তারা যাচাই ছাড়াই মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে, শুধুমাত্র ভুয়া সংবাদ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। এটি রোধ করার জন্য প্রয়োজন একটি টেকসই সমাধান, যা একইসঙ্গে প্রযুক্তি এবং সচেতনতা উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য খুব সজাসাপটা সমাধান আপাতত নেই কিন্তু সম্ভাব্য সমাধানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো একটি ন্যাশনাল অথবা গ্লোবাল ফেক নিউজ ইভ্যালুয়েশন নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা। এই নেটওয়ার্কের কাজ হবে বিশ্বব্যাপী সংবাদ বিশ্লেষণ এবং যাচাই করে তার নির্ভরযোগ্যতা নির্ধারণ করা। এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকবে একটি ইউনিফাইড কন্টেন্ট স্টোর, যেখানে প্রতিদিনের সংবাদ জমা হবে এবং তা বিশ্লেষণ করা হবে। এই প্রক্রিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আরও কার্যকর করা সম্ভব। এআই প্রযুক্তি কন্টেন্টের মূল উপাদান যেমন ঘটনা, স্থান, সময় ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক সংবাদ শনাক্ত করা যেতে পারে। এই সংবাদগুলো স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের কাছে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো ও বিশেষজ্ঞদের অনুমোদন এবং মূল্যায়নের মাধ্যমে কন্টেন্টের নির্ভরযোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে এবং তা একটি স্থায়ী ডেটাবেসে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
এছাড়া, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশক এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোরও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। তাদের কন্টেন্টের গুণমান এবং ভুয়া সংবাদের বিস্তারে তাদের ভূমিকা নির্ধারণ করা হবে। প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের ব্যবহারকারীদেরকে জানাতে পারবে, যদি তারা ভুল তথ্যের সাথে সম্পৃক্ত হয়। একইসঙ্গে, ভুয়া তথ্য রোধে ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে হবে এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা শেখাতে হবে।
ভুয়া সংবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই সমাধানগুলো শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত নয়, বরং এটি একটি সামাজিক আন্দোলনও। এটি মানুষকে আরও সচেতন এবং দায়িত্বশীল করে তুলবে। প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদের মিশ্রণে আমরা একটি বিশ্বব্যাপী সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে পারি।
